সেদিন বিয়ের সাজে ফিরছিল ফেলানী

নিউজ ডেস্কঃ
পিতা হাফেজ আলী যখন মারা যান, তখন ফেলানীর বাবা নুর ইসলামের বয়স নয় কি দশ বছর। অভাবের তাড়নায় কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর উপজেলার দক্ষিণ রামখানা কলোনীটারী থেকে বিধবা মা আলীজনের সাথে তিনি এবং তার ছোট ভাই আব্দুল খলিল ভারতের জলপাইগুড়িতে কাজের খোঁজে যান।

ওই সময় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ছিল না। জলপাইগুড়িতে তারা বেশ কিছুদিন থাকে। পরে মা আলীজন বিবির মৃত্যু হলে তাকে জলপাইগুড়িতে কবর দেয়া হয়। মায়ের মৃত্যুর পর অভাব তাদের মাঝে গ্রাস করলে দুই ভাই দুইদিকে কাজের সন্ধানে বের হয়। বিভিন্ন স্থানে কাজ করতে গিয়ে ভারতের আলীপুরে ফেলানীর মা জাহানারা বেগমের সাথে পরিচয় ঘটে।

জাহানারা একই ভাবে অভাবের তাড়নায় তার দাদীর সঙ্গে আলীপুরে থাকত। জাহানারা নুর ইসলামের গ্রামের বাড়ির পার্শ্ববর্তী গ্রাম নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ রামখানা বানারভিটার বাসিন্দা হওয়ায় প্রতিবেশী সম্পর্কে এক পর্যায় নুর ইসলাম ও জাহানারা বেগমের বিয়ে হয়। সংসারে দুই মেয়ে সন্তান জন্ম নিলেও জন্মের কিছুদিন পর মারা যায়। দুই সন্তানের মৃত্যুর পর স্বামী-স্ত্রী দুজনে আলীপুর ছেড়ে আসামের গোয়ালপাড়া জেলার নিউ বংগাইগাও ভাওলা গুড়িতে চলে যান। সেখানে জন্ম হয় ফেলানীর। দুই মেয়ে সন্তানের মত ফেলানীরও মৃত্যু হতে পারে এই আশংকায় তার নাম রাখা হয় ফেলানী।

পরে ফেলানীসহ আরও ৫ সন্তান আসে তার ঘরে। নিউ বংগাইগাঁও ভাওলা গুড়িতে একটি মুদির দোকান দিয়ে তাদের ৩ মেয়ে ও ৩ ছেলে নিয়ে ৮ সদস্যের সুখের সংসার চলছিল।

অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা স্বচ্ছল হলেও দেশের মায়া বার বার নুর ইসলামকে হাতছানি দিচ্ছিল। দেশে ফিরবে এই আশায় তারা আসামের নাগরিকত্বের সুযোগ পেলেও তা গ্রহণ করেনি।

নুর ইসলামের দেশে ফেরার প্রবল ইচ্ছাই এর মধ্যে সে বাংলাদেশের ভোটার হয়। পরে সে জাতীয় পরিচয়পত্র পায়। ভোটের সময় এলে আসাম থেকে এসে এখানকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন গুলোতে ভোট প্রয়োগ করতেন তিনি।

এর মধ্যে মেয়ে ফেলানী বড় হয়ে উঠলে তাকে বাংলাদেশে বিয়ে দিবে, মেয়ের জামাই হবে, বিয়াই-বিয়াইন পাবে ডানা বাঁধে এরকম স্বপ্ন। পরে শাশুড়ি হাজেরা বিবির সম্মতিক্রমে ছোট্টবেলায় কথা দেয়া স্ত্রী জাহানারা বেগমের আপন বড় বোনের ছেলের সাথে বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা চুড়ান্ত হয়। জাহানারার বোনের বাড়ি লালমনিরহাট জেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের চরকুলাঘাট গ্রামে। জাহানারার দুলাভাই ইদ্রিস আলী ও তার স্ত্রী আনজিনা বেগমের বড় ছেলে আমজাদ হোসেনের সঙ্গেই বিয়ের ব্যাপারে কথা চূড়ান্ত করা হয়। নুর ইসলাম আসাম থেকে এসে আমজাদ হোসেনের মায়ের সঙ্গে ২০১১ সালের ৯ জানুয়ারি বিয়ের দিন ধার্য অনুযায়ী মেয়ে ফেলানীকে নিয়ে ৬ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল ১১ টায় নুর ইসলাম আসাম থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

ফেলানীর মা জাহানারা বেগম মেয়েকে নিজ হাতে সাজিয়ে দেন। পরিয়ে দেন হাত, গলা, কান, নাকে ও পায়ে স্বর্ণ ও রুপার অলংকার। কে জানতো এই সাজানোই হবে ফেলানীর কাল? হবু জামাই আমজাদ হোসেনের জন্য দুইটি আংটি, একটি চেইনসহ মেয়ের হাত খরচের নগদ ১৯০০/- (ভারতীয়) টাকা সাথে দেন। ফেলানীও তার হবু জীবন সঙ্গীর জন্য একটি রুমাল, কিছু গিফ্ট সামগ্রী নিয়ে বাবার সাথে রওয়ানা হয়।

দীর্ঘ ৮ ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে তারা রাত ৮টার দিকে আসাম থেকে চৌধুরীহাট বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছলে ভারতীয় চৌধুরীহাট খেতাবের কুটি সীমান্তবর্তী গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে দালাল মোশাররফ হোসেন (৩৮) ও দালাল বুর্জত আলী (৩০) সহ ৩/৪জন দালাল তাদের পিছু নেয়।

দালালরা তাদেরকে কাঁটাতারের বেড়া পার করে দেয়ার জন্য ৩ হাজার টাকা চুক্তি করে। দালাল মোশাররফকে চুক্তির টাকা দেয়ার সময় ফেলানীর বাবা দালালের কাছে প্রতিশ্রুতি নেয় তার মেয়ের যেন কোন ক্ষতি না হয়। তার কথা মতো দালাল মোশাররফ ক্ষতি না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে আশ্বস্ত হন ফেলানীর বাবা।

পরে রাত ৯টার দিকে দালাল মোশাররফ হোসেন ফেলানী ও বাবাকে তার বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেখান থেকে কাঁটাতার বেড়া পার করে দেয়ার অজুহাতে দালাল মোশাররফ ফেলানী ও তার বাবাকে আরও ৩/৪টি বাড়িতে আনা নেওয়া করে।

রাত ৯টা থেকে রাত ৩/৪টা পর্যন্ত এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে টানা হেঁচড়া করায় ফেলানী একটু ঘুমাতে চেষ্টা করেও তা পায়নি। নির্ঘুম রাত কাটানো ও টানা হেঁচড়ায় ক্লান্ত ফেলানী ও তার বাবাকে ৭ জানুয়ারি ভোর রাতে ফজরের আজানের সময় ফুলবাড়ীর অনন্তপুর হাজীটারী সীমান্তের আন্তর্জাতিক পিলার ৯৪৭/৩এস এর পাশে ভারতের অভ্যন্তরের চৌধুরীহাট খেতাবের কুটি এলাকায় নিয়ে আসে দালালরা।

ওই এলাকায় কাঁটাতারের ৩ স্তরের বেড়া পার হতে বাঁশের তৈরি ৩টি মই কাঁটাতারের বেড়ায় লাগানো হয়। সেই মই বেয়ে প্রথমে নুর ইসলাম পরে মেয়ে ফেলানী পার হওয়ার সময় চৌধুরী হাট ক্যাম্পের বিএসএফ তাদের পিছু নেয়।

মই বেয়ে কাঁটাতার পার হওয়ার সময় তিনি ২/৩জন বিএসএফকে মইয়ের উপরে উঠতে দেখেন। একসময় একটি গুলির শব্দ হলে নুর ইসলাম ভয়ে পড়ে যান কাঁটাতারের বাহিরে। তখন মেয়ে ফেলানী ছিল কাঁটাতারের বেড়ার মাঝখানে মইয়ের উপর দাঁড়িয়ে। কাঁটা তারের বেড়া পার হয়ে ভারত ভূখণ্ডে পড়ে যাওয়া নুর ইসলাম তড়িঘড়ি উঠে ফেলানীকে তারাতারি কাঁটা তারের বেড়া পার হয়ে আসার জন্য বলেন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে আদরের ফেলানী যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে তা তিনি ঝুঝতে পারেননি।

চোখের পানি ফেলতে ফেলতে নুর ইসলাম বলেন, কাঁটাতারের মাঝখানে মইয়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ফেলানীকে গুলি করলে সে কাঁটাতারের বেড়ার মাঝখানে পড়ে থাকতো কিন্তু কিভাবে কাটাতার বেড়ার শেষ প্রান্তে ফেলানীর লাশ ঝুলে থাকলো হাজার বার এরকম প্রশ্ন তাকে তাড়া করেছে।

চোখের পানি মুছতে মুছতে নুর ইসলাম জানান, একটি গুলির শব্দ শুনলেও তিনি আরও একটি কম আওয়াজের গুলি হয়েছে বলে পরে মানুষের কাছে শুনেছেন। এতে তিনি ধারণা করেন তাকে ভয় দেখানোর জন্য একটি ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়েছিল ও পরে ফেলানীকে পাশবিকভাবে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তার লাশ কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখে বিএসএফ।

৭ জানুয়ারির ভোর থেকে সকাল সাড়ে ১১ টা পর্যন্ত কাঁটা তারের বেড়ায় ঝুলে ছিল ফেলানীর লাশ। ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম মেয়ের হত্যার কথা শুনে সংজ্ঞাহীন হন। সাড়ে ১০টার দিকে ফেলানীর মৃত্যুর খবর পায় তার পরিবার।

ওই দিন কুড়িগ্রাম বিজিবির ২৭ ব্যাটালিয়নের কাশিপুর কোম্পানির পক্ষ থেকে লাশ ফেরত চেয়ে বিএসএফকে পত্র দেয়া হলে ফেলানীর লাশ পোস্টমর্টেম শেষে পরের দিন ৮ জানুয়ারি বেলা ১১টায় ওই সীমান্তে বিজিবি কাশিপুর কোম্পানি ও বিএসএফ চৌধুরীহাট কোম্পানির পর্যায় পতাকা বৈঠকে বিজিবিকে ফেলানীর লাশ ফেরত দেয় বিএসএফ।

পরে বাংলাদেশে ফেলানীর পোস্টমর্টেম শেষে ৯ জানুয়ারি রাতে তার পরিবারের কাছে ফুলবাড়ী থানা পুলিশ লাশ হস্তান্তর করলে ওই রাতেই কলোনীটারী গ্রামে ফেলানীকে দাফন করা হয়।

ফেলানী হত্যার এই নির্মম ঝুলন্ত ছবি ও খবর দেশী-বিদেশী মিডিয়ায় প্রকাশ হলে দেশে-বিদেশে শুরু হয় বিএসএফের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদ। কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলছে না ফেলানী, ঝুলছে বাংলাদেশ শীর্ষক প্রতিবাদী স্লোগান ও ফেলানীর ঝুলন্ত ছবি। যা গোটা জাতিকে হতভম্ভ করে।

এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনের পক্ষে সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা বন্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ, মিছিল, সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হলে টনক নড়ে বাংলাদেশ সরকারের। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ফেলানী হত্যার কড়া প্রতিবাদ জানানো হয় ভারতকে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ও মানবাধিকার সংস্থার কর্মকর্তারা ছুটে আসে ফেলানীর নিভৃত পল্লীতে।

এরপর বিজিবির দাবির মুখে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারের বিএসএফের বিশেষ আদালতে ফেলানী হত্যার বিচার কাজ শুরু হয়।

সূত্রঃ breakingnews.com.bd